ফস্টার্স

ডক্টর ফস্টাস নাটকে ক্রিস্টোফার মার্লোর জীবনদর্শন ও যাদুবাস্তবতা

—– আলিয়া নেফারতিতি

********************

“ফস্টাসের ভয়াবহ পরিণতি জ্ঞানীদের এই শিক্ষা দিক – তারা যেন নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি কেবল দূর থেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে। কারণ এর গভীরতা প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদেরও সেগুলো অর্জন করতে প্রলুব্ধ করে, যা ঈশ্বর অনুমোদন করেন না।” – এলিজাবেথান পিরিয়ডের বিখ্যাত নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লো তাঁর জনপ্রিয় নাটক ‘ডক্টর ফস্টাস’ এ এটি লিখেছেন। মার্লো ১৫৬৪ সালে ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবেরিতে জন্মগ্রহণ করেন। এ হিসেবে তিনি এবং শেক্সপিয়ার সমবয়সী। ক্রিস্টোফার মার্লো কীট মার্লো নামেও পরিচিত। তাঁর বাবা ছিলেন জুতা প্রস্তুতকারক। মেধা বৃত্তি নিয়ে তিনি Corpus Christi College, Cambridge এ পড়াশোনা করেন। তিনি ১৫৮৪ সালে Bachelor of Arts (B.A.) এবং তিন বছর পরে Master of Arts (M.A.) ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করার সময় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেছেন। সেসময় অর্থাৎ ১৬ শ শতকের ইংল্যান্ডে ক্যাথলিক ধর্ম পালন করা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। এ কারণে উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর এম.এ. ডিগ্রি প্রায় বাতিল হয়ে যাচ্ছিল। তবে রানীর কাউন্সিল বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে যাতে মার্লো সমাবর্তনে তাঁর ডিগ্রি লাভ করতে পারেন।

মার্লো ১৫৮৭ সালে ক্যামব্রিজ ত্যাগ করেন এবং নাট্যমঞ্চের জন্য লিখতে শুরু করেন। লন্ডনের মঞ্চে অভিনীত তাঁর প্রথম নাটক ‘Tamburlaine’ যা ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম দিকের blank verse এ রচিত নাটক গুলোর একটি। তাঁর নাটকগুলো সেসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। অকালমৃত্যুর আগের বছরগুলোতে মার্লো ‘Doctor Faustus’, ‘The Jew of Malta’, এবং ‘The Massacre at Paris’-এর মতো চমৎকার সব নাটক রচনা করেন।

 

মার্লোর জীবনের শেষ অংশটি ছিল সহিংস এবং কিছু সন্দেহজনক ঘটনায় ভরা। পণ্ডিত লিসা হপকিন্স জানান যে, মার্লো শোরডিচ শহরের দুজন কনস্টেবলের সামনে এমন এক হুমকিস্বরূপ রূপে হাজির হয়েছিলেন যে তাঁকে অত্যন্ত বিপদজনক বলে মনে হয়েছিল। পরিস্থিতি এতোই জটিল রূপ নেয় যে সেই কনস্টেবলরা মার্লোর হাত থেকে নিজেদের জীবন বাঁচাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছিলেন। অনেক গবেষক‌ই বিস্মিত হয়ে ভাবেন যে একজন মানুষ ঠিক কতটা ক্ষ্যাপাটে হলে পুলিশ‌ই তাঁকে ভয় পায়!

 

ক্রিস্টোফারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে অনেকের মতে, তিনি একটি ডেপ্টফোর্ড হাউসের ভাড়া করা কক্ষে এক দলের সাথে ভোজ করছিলেন। এমন সময় ইনগ্রাম ফিজার নামে এক ব্যক্তির সাথে তাঁর ঝগড়া হয় এবং তিনি মার্লোর ডান চোখে ছুরিকাঘাত করে ঘটনাস্থলেই তাঁকে হত্যা করেন। ১৫৯৩ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মার্লো মারা যান। ফিজার একে আত্মরক্ষা বলে দাবি করেন এবং পরবর্তীতে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে মার্লো একসময় জেল‌ও খেঁটেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্ল্যাসফেমি (ঈশ্বর নিন্দা), সমকামিতা, গোপন নাস্তিকতা, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর জনসমক্ষে দেওয়া অসম্মানজনক বক্তব্য সম্বলিত নথি পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।

 

ক্রিস্টোফার মার্লো ছিলেন একজন অভিনেতা, কবি ও নাট্যকার। এছাড়াও তিনি সরকারের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন। খুব সম্ভবত গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে নিজ দেশের সেবা করতে গিয়ে তিনি হিংস্র ভাবে মারা যান। ব্যক্তিজীবনে বিভিন্ন নেতিবাচক দিক থাকলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম ছিল অসাধারণ যা আজ‌ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

‘ডক্টর ফস্টাস’ সম্ভবত ১৫৯২ সালে লেখা হয়েছিল, কারণ এটি রচনা করার প্রায় এক দশক পরে প্রকাশিত হয়েছিল। মার্লোর এই নাটকের প্রত্যক্ষ উৎস ছিল ১৫৮৭ সালের একটি বেনামী জার্মান রচনা ‘Historia Von D.Iohan Fausten’, যেখান থেকে তাঁর নাটকের কাহিনীর সিংহভাগ গ্রহণ করা হয়েছে। মার্লোর নাটকের আগেও ফস্টাসকে নিয়ে সাহিত্যিক উপস্থাপনা ছিল, তবে ‘ডক্টর ফস্টাস’ ই এই কাহিনীর প্রথম বিখ্যাত সংস্করণ।

 

কাহিনী সংক্ষেপ: ক্রিস্টোফার মার্লোর বিখ্যাত নাটক ‘The Tragical History of Doctor Faustus’ সংক্ষেপে ‘Doctor Faustus’ হিসেবে অধিক পরিচিত। উক্ত নাটকের প্রধান চরিত্র ডক্টর ফস্টাস হলেন উইটেনবার্গের একজন প্রতিভাবান জার্মান পণ্ডিত। তিনি দর্শন, আইন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বসহ প্রচলিত সকল বিদ্যা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের অর্জিত জ্ঞানের প্রতি অতৃপ্ত থাকার কারণে তিনি ব্ল্যাক ম্যাজিক শেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভ্যালডেস ও কর্নেলিয়াস নামে দুই জাদুবিদ্যাবিশারদদের কাছ থেকে জাদুবিদ্যা শেখা শুরু করেন। ফস্টাসের সামনে ভালো দেবদূত (Good Angel) এবং মন্দ দেবদূত (Bad Angel) হাজির হয়। ভালো দেবদূত তাঁকে জাদুবিদ্যার পথ পরিহার করতে বলে এবং মন্দ দেবদূত তাঁকে প্রলুব্ধ করে। শেষ পর্যন্ত ফস্টাস জাদুবিদ্যার অশুভ পথ‌ই বেছে নেন।

জাদুমন্ত্রের মাধ্যমে তিনি লুসিফারের (প্রধান শয়তান) দূত মেফিস্টোফিলিস নামে এক শয়তানকে আহ্বান করেন। তার মাধ্যমে ফস্টাস লুসিফারের কাছে প্রস্তাব পাঠান যে, তিনি নিজের আত্মা শয়তানের কাছে বিক্রি করবেন, বিনিময়ে ২৪ বছর অসীম ক্ষমতা লাভ করবেন এবং মেফিস্টোফিলিস তাঁর দাস হিসেবে নিযুক্ত থাকবে।

লুসিফার এই চুক্তিতে রাজি হয় এবং ফস্টাস নিজের রক্ত দিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। সাক্ষরের সময় তাঁর রক্ত জমে যায়, যেন প্রকৃতিই তাঁকে এই চুক্তি করা থেকে বিরত রাখতে চায়। তবুও তিনি চুক্তি সম্পন্ন করেন। এরপর‌ই তাঁর মনে অনুশোচনা জাগে কিন্তু মেফিস্টোফিলিস নানা রকম সম্পদ ও বিনোদন দেখিয়ে তাঁকে ভুলিয়ে রাখে। ফস্টাস বারবার মহাবিশ্ব, সৃষ্টিজগত ও নরক সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তিনি জানতে চান যে পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন। কারণ স্বভাবতই একজন জ্ঞান পিপাসু হিসেবে তিনি নিজের জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে চান। কিন্তু মেফিস্টোফিলিস উত্তর দিতে অস্বীকার করে, কারণ উত্তর দিলে ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করতে হবে। এর ফলে ফস্টাসের মনে আবার অনুশোচনা জন্মে। কিন্তু শয়তান তাঁকে সাতটি মারাত্মক পাপ (Seven Deadly Sins) – এর রূপ দেখিয়ে আনন্দ দেয় এবং ঈশ্বর ও খ্রিস্টের কথা ভুলিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। ফস্টাস ড্রাগন দ্বারা চালিত রথে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণ করেন এবং জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর রোমে গিয়ে ফস্টাস ও মেফিস্টোফিলিস নিজেদের অদৃশ্য করে এবং জাদুবিদ্যার সাহায্যে সেখানকার পোপের সাথে দুষ্টুমি করে।

জার্মান রাজা পঞ্চম চার্লসের (Charles V) আমন্ত্রণে ফস্টাস রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে জাদু প্রদর্শন করেন যা রাজাকে মুগ্ধ করে। তবে বেনভোলিও নামের একজন নাইট ও তার বন্ধুরা তাঁর জাদুবিদ্যায় সন্দেহ করলে ফস্টাস ভুতদের দিয়ে তাদের ওপর আঘাত হানেন এবং তাদের মাথায় শিং গজিয়ে দেন। এরপর এক ঘোড়া ব্যবসায়ী ফস্টাসের কাছ থেকে ঘোড়া কিনে প্রতারণার শিকার হয় এবং জাদুর মাধ্যমে ফস্টাস তার সাথে ভয়ঙ্করভাবে মজা নেন।

ফস্টাসের জাদুর মাধ্যমে যারা বিভিন্ন ভাবে প্রতারিত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল তারা ভ্যানহোল্টের ডিউকের কাছে ফস্টাসের কৃতকর্মের জন্য বিচার চাইতে যায়। তবে রাজদরবারে পৌঁছানোর আগেই ফস্টাস ডিউক ও ডাচেসকে জাদু প্রদর্শন করে বিনোদন প্রদান করেন যার ফলে তিনি তাঁদের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন।

চুক্তির মেয়াদ যতোই ফুরিয়ে আসে ফস্টাসের অনুশোচনা ততোই বাড়তে থাকে। সহকর্মী পণ্ডিতদের অনুরোধে ফস্টাস বিশ্বের সবথেকে সুন্দর নারী ট্রয়ের হেলেনের আত্মাকে আহ্বান করেন। পরবর্তীতে এক বৃদ্ধ লোক ফস্টাসকে তাঁর কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ঈশ্বরের কাছে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু ফস্টাস শয়তানের পক্ষে থাকার‌ই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মেফিস্টোফিলিসকে ট্রয়ের হেলেনকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে বলেন যাতে শেষ দিনগুলোতে প্রেমিক হিসেবে তিনি হেলেনের সঙ্গ পান। মেফিস্টোফিলিস রাজি হয়ে যায়।

চুক্তির ২৪ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে এলে ফস্টাস তাঁর বন্ধুদের জানান যে তিনি অভিশপ্ত হয়েছেন, আত্মার বিনিময়ে তিনি অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। বন্ধুরা চিন্তিত হয়ে তাঁর জন্য প্রার্থনা করে চলে যান।

 

চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার এক ঘন্টা আগে ফস্টাস সময়কে থেমে যেতে অনুরোধ করেন। তিনি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইতে চান তবে ব্যর্থ হন। নরকের দরজা খুলে যায়। মন্দ দেবদূত তাঁকে ভয়ানক সব শাস্তির বর্ণনা দেয়।

অবশেষে রাত এগারোটা বাজতেই শয়তানরা ফস্টাসের আত্মাকে জোরপূর্বক নরকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। পরে পণ্ডিত বন্ধুরা এসে তাঁর টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া মৃতদেহ খুঁজে পান। এমন ভয়ঙ্করভাবেই ফস্টাসের জীবন প্রদীপ নিভে যায়।

 

শিক্ষা ও তাৎপর্য: উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা ভালো, কারণ সফলতা অর্জন করতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। সীমা লঙ্ঘন করে যখন তা অন্ধ লোভে পরিণত হয় তখন ধ্বংস অনিবার্য। ফস্টাস মহান জ্ঞানী হ‌ওয়া সত্ত্বেও কল্পনাতীত জ্ঞান, ক্ষমতা এবং সম্পদের লোভে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, নিজ অর্জনে সবসময় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ন‌ইলে সীমা লঙ্ঘন করে অসৎ উপায়ে কোনোকিছু অর্জন করতে চাইলে সবকিছুই হারাতে হবে।

এছাড়াও ফস্টাস তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য নিয়ে অহংকার করতে শুরু করেন। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ মনে করতেন। অপরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাদের বিভিন্ন উপায়ে বিরক্ত করে মজা পেতেন। অহংকার তাঁর বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছিল। ভালো দেবদূত (Good Angel) ছিল মূলত বিবেকের প্রতীক যা প্রতিনিয়ত ফস্টাসকে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতো কিন্তু তিনি এটিকে অবহেলা করে শয়তানের পথে চলতেন।

 

ফস্টাস ২৪ বছরের সাময়িক ক্ষমতার জন্য নিজের আত্মা অনন্তকালের জন্য বিসর্জন দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় আমাদের জীবনের যেকোনো সীদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতির কথা চিন্তা করতে হবে।

বিভিন্ন সময়ে ফস্টাস নিজের ভুল বুঝতে পারেন কিন্তু শয়তানের পথ হতে নিজেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হন। তবে যখন তিনি নিজেকে সংশোধন করতে চান তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। ফস্টাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের ভুল হতেই পারে কিন্তু তা সংশোধন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সঠিক পথে ফিরে আসতে না পারলে শাস্তি ভোগ করতে হয়।