আলোর নিমিত্তে আগুন

‘পথের দাবী’ আলোর নিমিত্তে আগুন

-তাহা ইয়াসিন

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮) ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ধারাবাহিকভাবে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়| ১৯২৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘রাজদ্রোহমূলক’ রচনা- এই অভিযোগে ইংরেজ সরকার বইটির প্রচার বন্ধ করেন| বইটি রাজরোষমুক্ত হয় ১৯৩৯ সালে| পত্রিকায় প্রকাশিত উন্যাসটির কিছু সংশোধন তিনি করেছিলেন| সেই সংশোধিত রূপই বর্তমান রূপ| এই উপন্যাস যখন লেখেন তখন ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বজন পরিচিত| এটি লেখার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর| শরৎচন্দ্রের জীবনকাল ছিল ভারতবর্ষের রেনেসাঁ আন্দোলন বা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ¯^াধীনতা আন্দোলনের উত্তাল জোয়ারের কাল| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর উপমহাদেশে ¯^াধীনতার জন্য ˆবপ্লবিক গণঅভ্যুত্থান তখন শুরু হয়েছে| এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এক দীর্ঘ রেনেসাঁসের পথ ধরেই| আর সে রেনেসাঁসের শুরু হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের মাধ্যমে| ইউরোপের বুর্জোয়া মানবতাবাদী ধ্যানধারণা ও চিন্তাভাবনাগুলোকে ধর্মের মূল সুরটির সঙ্গে মিলিয়ে ধর্মীয় সংস্কারের পথেই রামমোহন রায় এদেশে রেনেসাঁ আন্দোলনের জন্ম দেন| ফলে ধর্মীয় সংস্কারের পথ ধরে এদেশে রেনেসাঁ আন্দোলন ধীরে ধীরে এগোতে থাকে| পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরের অভ্যুত্থান এই আন্দোলনে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় সংস্কারের পথে রেনেসা আন্দোলনের মধ্যে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটান| তিনি এদেশে মানবতাবাদী আন্দোলনকে ইতিহাস বিজ্ঞান ও যুক্তির শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করান| বিদ্যাসাগরকে এ দেশের মানুষ বড় মানুষ বলে জানেন, শ্রদ্ধা করেন| কিন্তু তাকে বুঝেছেন অল্পজনই| বেশিরভাগ মানুষ বিদ্যাসাগরের হাঁটুর ওপর কাপড় পরা মাথায় টিকি রাখা দেখেই তাঁকে একজন ˆনষ্ঠিক ব্রাহ্মণ বলেই ভাবেন| বাইরের বেশভূষায় তাকে শাস্ত্রকারের মতো এবং ˆনষ্ঠিক ব্রাহ্মণ বলে মনে হলেও ভিতরে তিনি ছিলেন তদানীন্তন ভারতীয় সমাজপরিবেশে একজন খাঁটি হিউম্যানিস্ট| ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানসভ্যতার একটি যুক্তিভিত্তিক সংযোগ সাধন তিনি করতে চেয়েছিলেন| তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘ছাত্রদের ইংরাজি শেখাও, মিলের লজিক পড়াও| সংস্কৃত শিখিয়ে কুজ হয়ে যাওয়া এই জাতির মেরুদণ্ড খাড়া করা যাবে না| এই জাতির মেরুদণ্ড খাড়া করতে হলে বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁকে পরিচিত হওয়ার সুােগ দিতে হবে|’ শিক্ষা সংক্রান্ত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করলে সহজে ধরা পড়বে ধর্মীয় সংস্কারের পথে ভারতবর্ষে রামমোহন রায়ের সময় থেকে যে রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হয় বিদ্যাসাগর ছিলেন সেই ধারার বলিষ্ঠ ছেদ|

বিদ্যাসাগরের যুগ পর হয়ে এসে এদেশে রেনেসাঁ আন্দোলন পুনরায় ধর্মীয় সংস্কারের পথ ধরেই এগোতে থাকে| একদিকে হিন্দুসমাজকে সংস্কার করে দোষত্রুটিমুক্ত করার জন্য ব্রাহ্মধর্মের প্রবল জোয়ার অপরদিকে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের তুমুল আন্দোলনও শুরু হয়| হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই হিন্দুসমাজকে জাতপাতও কলুষতা থেকে মুক্ত করার জন্য এ ধর্মের সংস্কারকরা আসেন। এ পর্বেই রামকৃষ্ণের আবির্ভাব| বিবেকানন্দও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের বিস্ময়কর সৃষ্টি| তিনি রেনেসাঁ আন্দোলনকে শুধু ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন না| উপাসনা এবং সাধনার পরিবর্তে কর্ময়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন| সারা দেশে জাত্যাভিমান ও দেশাত্মবোধেরও বিকাশ শুরু হয়| তিনি যে জাত্যাভিমান ও দেশাত্মবোধের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন তা বেদান্ত দর্শন ও ভারতীয় অতীত আধ্যাত্মিক গর্বের ভিত্তিতে| অনেকটা এ কারণেই পরবর্তীকালে দেশজোড়া যে তীব্র ¯^াধীনতা আন্দোলন গড়ে উঠে তা মূলত হিন্দুধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদই থেকেছে| এরপর ধীরে ধীরে দেশের অভ্যন্তরে ¯^াধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও ¯^াধীনতা আন্দোলন যখন প্রবল আকার ধারণ করে ঠিক সে সময়ই বাংলার সমাজে সাহিত্যিক হিসেবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাব| ধর্মীয় সংস্কারের পথে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা যেমন মানবতাবাদী আন্দোলনকে তদানীন্তন সমাজ পরিবেশে ধমীয় প্রভাব ও ধর্মীয় যুক্তিবিচার থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে একটা ছেদ, তেমনি ¯^াধীনতা আন্দোলনের মধ্যে হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মের সঙ্গে আপসকামী জরাগ্রস্ত মানবতাবাদী চিন্তাভাবনা থেকে শরৎচন্দ্র একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনাকারী| তাঁর সাহিত্য চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বস্তুতান্ত্রিক| সাহিত্য চিন্তায় যেখানে তিনি ধারাবাহিকভাবে বস্তুতান্ত্রিক থাকতে পারেননি সেখানে এগনস্টিক (সংশয়বাদী) থেকেছেন| আধ্যাত্মবাদী চিন্তাভাবনাকে কখনো প্রশ্রয় দেননি| তিনি মানুষের হৃদয়ে ব্যথাবেদনা জাগিয়ে দিয়ে এবং বড়কে পাওয়ার জন্য মানসিক অভাববোধ সৃষ্টি করে সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন| ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ¯^াধীনতা আন্দোলন শুরু থেকেই দুটো ধারায় বিভক্ত হয়ে এগিয়েছিল| একটি আপসকামী অন্যটি আপসহীন| রাজনৈতিক আন্দোলনে আপসকামী ধারার নেতৃত্ব করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী| গান্ধিজি রামমোহন রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ ধারার প্রতিনিধি| অন্যদিকে আপসহীনধারা সর্বোত্তম বিকশিত হয়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্য দিয়ে| তিনি বিদ্যাসাগর চিত্তরঞ্জন প্রভৃতির প্রতিনিধিত্বকারী| ১৯১৯ সালে রাজদ্রোহ দমনের নামে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য সরকারের হাতে অ¯^াভাবিক ক্ষমতাদানের উদ্দেশ্যে রাউলাট আইন ইংরেজ সরকার প্রবর্তন করেন সে আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ হয়| শরৎচন্দ্রও তাতে অংশগ্রহণ করেন| পরে চিত্তরঞ্জন দাসের অনুরোধে কংগ্রেসে যোগদান করেন| হুগলী জেলার সভাপতি পদও লাভ করেন কিন্তু কিছুদিন পর পদত্যাগ করে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসেন| সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল| উল্লেখ্য যে, সে সময় কংগ্রেসে দুধারার প্রতিনিধিই ছিল| অল্প কিছুকালের মধ্যে সেটা পৃথক রূপ গ্রহণ করে|
নজরুলও ছিলেন আপসহীন ধারার সাহিত্যিক| এই ধারার আন্দোলনকারীদের অনেককে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন| ভগৎসিং, ক্ষুদিরাম তাঁদের অন্যতম| ক্ষুদিরামের ফাঁসির সময়ের একটা গান আছে, ক্ষুদিরাম গেয়েছে— ‘দশমাস দশদিন পরে/জনম নেবো মাসীর ঘরে মাগো/তখন যদি মা চিনতে না পারিস/দেখবি গলায় ফাঁসি|’ ক্ষুদিরামকে কেন্দ্র করে ওই গানের আলোকে নজরুল লিখেছিলেন, ‘সেই হারাক্রন্দনের আশ্বাস গান শুনে আজো অতিবড় পাষাণী মেয়ের চোখে জল আসে| গা শিউরে ওঠে| আমাদের মতো কাপালিকেরও রক্ত আঁশি আঁখির সলিলে টলমল করে| কিন্তু বলতে পার কি দেশের জননীরা আমাদের সেই হারা ক্ষুদিরাম তোমাদের কার ঘরে এসেছে|’ আজো প্রত্যেক জননীর ঘরেই সন্তান আসে কিন্তু ক্ষুদিরাম আর আসেনি| কোটি কোটি সন্তানের জন্ম কোনো সাড়া জাগাতে পারেনি| সে সময়ের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লববাদীদের মৃত্যু মানুষের চেতনালোকের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল| কোনো দরকষাকষি নয়, ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস নয়, সোজা কথা ভারতের পূর্ণ ¯^াধীনতা চাই| কলকাতার সুতানটিতে ব্যবসার নামে ঠাঁই নিয়ে আস্তে আস্তে গোটা রাজ্যটার টুঁটি চিপে ধরেছে যে ইংরেজ তার সঙ্গে কোনো আপস চাননি ক্ষুদিরাম প্রমুখ আপসহীনধারার বিপ্লববাদীরা| ঠিক এমনই এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ভারতবর্ষের আকাশে যখন ¯^াধীনতার সূর্য ওঠার অপেক্ষায়| মুক্তির সোপানতলে যখন একে একে প্রাণের বলিদান চলছিল তখনই শরৎচন্দ্র লিখলেন ‘পথের দাবী’| উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচীও সোজা বললেন, এক. মৃত্যু, দুই. ভারতের ¯^াধীনতা| সব্যসাচী আন্তর্জাতিক মানের চরিত্র| সে একাধিক ভাষা জানে| ব্রিটিশ আমেরিকা প্রভৃতি দেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে|

উপন্যাসের স্থান বার্মা এবং তার পাশে ভারত| রেঙ্গুন শহরে ভারতীয় শ্রমিকক অধ্যুষিত কারখানা এলাকায় বসবাসকারী বাঙালি শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে ওঠা ‘পথের দাবী’ সংগঠন| সকল ধর্মের সকল বর্ণের এবং সকল অঞ্চলের মানষের সমবেতরূপ নিয়ে গড়ে উঠেছে পথের দাবী সংগঠন| শ্রমিক এলাকায় একটা স্কুল বাড়ি| উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র অপূর্ব হল গোঁড়া ব্রাহ্মণ|
লেখাপড়া শিখেছে ভদ্র লোকের ছেলে পরাধীনতার লজ্জা সে অনুভব করে| আর দশজন বাঙালির ছেলের মতো সত্যসত্যই সে ¯^দেশের কল্যাণ প্রার্থনা করে| তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় যে নারী চরিত্রের তার নাম ভারতী| সে খ্রিস্টান| তাদের দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল রেঙ্গুনেই প্রতিবেশী হিসেবে| তারপর প্রেম ও বিচ্ছেদ| এই শ্রমিক এলাকায় স্কুল বাড়িতে আবার দেখা| অপূর্ব এখানে ভারতীকে নতুন রূপে দেখে| বিপ্লবীদের গণসংগঠন ‘পথের দাবী’| কাঁচা ঝাউপাতা দিয়ে লেখা কয়েকটা অক্ষর| অপুর্ব জিজ্ঞেস করে ভারতীকে, ওটা কি লেখা ওখানে? ভারতী পড়তে বলে| অপূর্ব পড়ে এবং অর্থ জানতে চায় ভারতী অপূর্বকে সভ্য হওয়ার আহ্বান জানায় এবং সংগঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলে ‘আমরা সবাই পথিক| মানুষের মনুষ্যত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙেচুরে চলব| আমাদের পরে যারা আসবে তারা যেন নিরুপদ্রবে হাঁটতে পারে| এই আমাদের পণ| আসবে আমাদের দলে?’

এরপর ভারতী অপূর্বকে শ্রমিক এলাকা ঘুরে দেখায়| অপূর্ব ভারতীর টানে আস্তে আস্তে পথের দাবীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়| পথের দাবীর সংগঠক সব্যসাচীর নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরে যখন তারা আবার গুছিয়ে উঠার চেষ্টা করে তখন ইংরেজ শাসিত বার্মার ইরাবতী তীরে রেঙ্গুন শহরের পুলিশত খবর পায় যে সাব্যসাচী নামক এক বিপ্লবী ভারত থেকে জাহাজযোগে রেঙ্গুনে নামছে| সাব্যবাচী নামে গিরিশ মহাপাত্র নামক এক তেলকল শ্রমিকের ছদ্মবেশে| কিছুক্ষণ পর সে ধরা পড়লে সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে| এমন একটা টান টান সময়ে অপূর্বের উপলব্ধিতে আসে, ‘উপরে নিচে, জলে স্থলে, এত নরনারী দাঁড়াইয়া; কাহারও কোনো শঙ্কা, কোনো অপরাধ নেই, শুধু যে লোক তাহার তরুণ হৃদয়ের সকল সুখ, সকল ¯^ার্থ, সকল আশা ¯ে^চ্ছায় বিসর্জন দিয়াছে, কারাগার ও মৃত্যুর পথ কি কেবল তাহারই জন্য হা করিয়া রহিয়াছে| জাহাজ জেটির গায়ে আসিয়া ভিড়িল, কাঠের সিঁড়ি নিচে আসিয়া লাগিল, নিমাইবাবু (পুলিশ) তাহার দলবল লইয়া পথের দুধারে সারি দিয়া দাঁড়ালেন, কিন্তু অপূর্ব নড়িল না| সেখানে নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া একান্ত মনে বলিতে লাগিল এবং যাহাকে সে কোনোদিন দেখে নাই, তাহাকেই স¤ে^াধন করিয়া মনে মনে বলিতে লাগিল| তুমিতো আমাদের মতো সোজা মানুষ নও—তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ, তাইতো দেশের খেয়াতরী তোমাকে বাহিতে পারে না, সাঁতার দিয়া তোমাকে পদ্মা পার হইতে হয়, তাইতো রাজপথ তোমার কাছে রুদ্ধ, দুর্গম পাহাড় পর্বত তোমাকে ডিঙ্গাইয়া চলিতে হয়— কোন বিস্তৃত অতীতে তোমারই জন্য ত প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল— কারাগার তো শুধু তোমাকে মনে করিয়াই প্রথম নির্মিত হইয়াছিল— সেইতো তোমার গৌরব| তোমাকে অবহেলা করিবে সাধ্য কার| এই অগণিত প্রহরী, এই যে বিপুল ˆসন্যভার সেতো কেবল তোমারই জন্য| দুঃখের দু:সহ গুরুভার তুমি বহিতে পার বলিয়াই ত ভগবান এত বোঝা তোমারই স্কন্ধে অর্পণ করিয়াছেন| মুক্তি পথের অগ্রদূত! পরাধীন দেশের হে রাজদ্রোহী তোমাকে শত কোটি নমস্কার!’

সব্যসাচী পথের দাবীর প্রাণ| অন্য সব চরিত্র তাকে ডাক্তারবাবু বলে স¤ে^াধন করে| ডাক্তারবাবুর সাধারণ চেহারার জন্য পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি| সে এত ছদ্মবেশ নিয়েছিল যে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পার পেয়ে যান | ডাক্তারবাবুর স্নেহের পাত্রী ভারতী| অপূর্বকেও সেই স্নেহের গণ্ডিতে টেনে নিয়েছিলেন| কিন্তু অপূর্ব এক সময় পুলিশকে পথের দাবীর সব গোপন সংবাদ ফাঁস করে দেয়| পথের দাবীর পক্ষ থেকে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়| ডাক্তারবাবু অপূর্বকে বাঁচিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অদ্ভুত যুক্তি দাড় করান| অপূর্ব যা করে ফেলেছে, সে আর ফিরবে না| তার ফলাফল আমাদের নিতেই হবে| শাস্তি দিলেও হবে, না দিলেও হবে’| অপূর্ব প্রকৃত বিশ্বাসঘাতক নন, তার দুর্বল চরিত্রের জন্য সে এমন কাজ করেছিল তাই সাব্যসাচী তাকে বাঁচান| এরপর অপূর্ব এবং ভারতীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে| উপন্যাসের শেষে আবার তাদের মিলন হয়| অপূর্ব এবং ভারতীয় এই মিলনের জন্য প্রায় সমালোচক এ দুজনকে নায়ক-নায়িকা বলেছেন কিন্তু উপন্যাসের সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ সংঘটিত হয়েছে সব্যসাচীকে কেন্দ্র করে| পথের দাবীর সমস্ত আবেদন সৃষ্টি হয়েছে সব্যসাচীর মাধ্যমে এজন্য সব্যসাচীকে এ উপন্যাসের নায়ক বলা যায়| অপূর্ব ভারতীর মমতা ভালোবাসার কোমল ইতিবৃত্ত মিশেছে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আয়োজনের এক নির্মম সাধনার ইতিবৃত্তে| এই নির্মম সাধনার মহান ব্যক্তি সব্যসাচী| সব্যসাচী এবং উপন্যাসের আরেক কেন্দ্রী নারীচরিত্র সুমিত্রার মধ্যে প্রেমের একটি অন্তর্লীন ধারা প্রবাহিত হয়েছে| কিন্তু এই সংগঠক চরিত্র দুটি ঘর বাঁধবার ¯^প্ন দেখাটাকে অপরাধ মনে করে| কারণ মাতৃভূমি পরাধীন| সুতরাং এখানে বিচ্ছেদ অনিবার্য| ভারতবর্ষের মুক্তিই তাদের ঘরবাঁধা কিংবা ভালোবাসার অঙ্গ| অন্যান্য চরিত্র রামাদান, শশী, তলোয়ার কর, ব্রজেন্দ্র, কৃষ্ণআইয়ার প্রভৃতি সকলে সর্বসাচীকে বলিষ্ঠতা দেওয়ার জন্য সার্থক সৃষ্টি|

শশী এই উপন্যাসে একজন কবি| সে কবিতা লেখে| সব্যসাচী তাকে নিয়ে আশা ব্যক্ত করে ‘শশী হবে আমাদের জাতীয় কবি| হিন্দু নয়, মুসলমানের নয় খ্রিস্টানের নয়, শুধু আমার বাংলাদেশের কবি|’ বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে| ভারতী যখন সব্যসাচীকে বলে সে ইংরেজিতে কবিতা লিখতে পারবে সব্যসাচী বলে ‘না না ভারতী, ইংরেজি নয় শুধু বাংলা, শুধু এই সাতকোটি লোকের মাতৃভাষায় লিখবে|’ সব্যসাচী পৃথিবীর বহুদেশ ঘুরেছে, অনেক ভাষা জানে, কিন্তু এমন দেশ এবং এমন মধু দিয়ে ভরা ভাষা আর সে খুঁজে পায়নি| পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন শরৎচন্দ্র| উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের প্রতি প্রতিবাদ এবং ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে| দুনিয়াব্যাপী দখলদারি আগ্রাসী রাষ্ট্রসমূহের আগ্রাসনের চিত্র মাথায় রেখে তিনি সেদিনের ইংরেজের চরিত্র তুলে ধরেছেন| ১৯১০ সালে জাপানের কোরিয়া রাজ্য আত্মসাৎ আফিম বিষ দিয়ে চীন জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া, একশ বছরের জন্য হংকং দখল প্রভৃতি পটভূমি শরৎচন্দ্রের মনে গভীর আঁচ ফেলেছিল| পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে চেয়ে দেখে সব্যসাচী অনুভব করেছে— ইউরোপের বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা থেকে দুর্বল কোনো জাতিই আত্মরক্ষা করতে পারেনি| লক্ষ্যহীন উলঙ্গ ¯র্থ এবং পশুশক্তির একান্ত প্রাধান্যই দখলদারিদের মূলমন্ত্র| আমেরিকা ইংল্যান্ডের আফগান, ইরাক দখল, ২০২৫ সালে দক্ষিণ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকার ধরে

নিয়ে যাওয়া,কিংবা ইরানে হামলা চালিয়ে সেদেশের সর্বোচ্চ নেতা খোমেনীকে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে আমারিকার হত্যা করা লক্ষ করলে সে চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে| সাতাত্তর বছর পূর্বে শরৎচন্দ্র সাম্রাজ্যবাদীদের চরিত্র সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছিলেন বর্তমানেও তার ¯^রূপ তেমনই আছে| পরিবর্তন হয়েছে শুধু আমাদের দেখবার দৃষ্টিভঙ্গির| ব্রিটিশ শাসনের সময় সকলে বুঝেছিল এর ¯^রূপকে কিন্তু আজ ¯^াধীন দেশে তার অদৃশ্য পদচারণা আমরা দেখতে পাই না| সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনে প্রায় গরিব দেশগুলোর শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প কলকারখানা, সরকার ব্যবস্থার ভিতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়েছে| মানুষের হৃদয়ে আজ সে বেদনার হাহাকার নেই| যেমনটি সেদিনের সমাজে ছিল এবং সেকথাই সব্যসাচী বলে ‘আমার বুকের আগুন নেভে শুধু দুটো জিনিস দিয়ে, একক নিজের চিতা ভস্মে আর নেভে যেদিন শুনবো ইউরোপের ধর্ম, সভ্যতা, নীতি সমুদ্রের অতলে র্ ডুবেছে|’ এমন কথা আজ সাহিত্য শিল্পের চরিত্র দিয়েও কেউ বলে না| মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাবেই এমন চরিত্র সৃষ্টি হয় না যা ভিতর থেকে মানুষের মধ্যে আগুন জ্বালায়|

দার্শনিক চিন্তাসমূহকে শরৎচন্দ্র এভাবেই উপন্যাসে মিশিয়ে দিয়েছেন| সব্যসাচী বলেছেন— পথের দাবীর ভালো-মন্দ দিয়ে তার সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হয়| এটাই তার নীতিশাস্ত্র| চরমসত্য পরমসত্য এই অর্থহীন নিষ্ফল শব্দগুলোর প্রতি তার আস্থা নেই, মূর্খ ভোলাবার এতবড় জাদুমন্ত্র আর নেই বলে তার বিশ্বাস| দেশের ¯^াধীনতার মধ্যে সর্বাঙ্গীন কল্যাণের প্রশ্নটি জড়িত আর এটাই যেন পথের দাবীর মূলমন্ত্র| রাষ্ট্রী ¯^াধীনতার সঙ্গে সঙ্গে পথের দাবী মানবীয় ¯^াধীনতার কথাও বলে| এখানে জাতপাত উঁচুনিচু ব্রাহ্মণ-শূদ্র, মুসলিম-খ্রিস্টান সকল ভেদাভেদের অবসান ঘটিয়ে একটা বৃহত্তর মানব কল্যাণমূলক ¯^াধীন ভারতীয় রাষ্ট্র শরৎচন্দ্র কামনা করেছিলেন| শুধু বর্ণভেদের মানুষগুলো যারা এ ভূখণ্ডে অবস্থান করছে তাদের ভৌগোলিক ¯^াধীনতাই পথের দাবী চায়নি| পথের দাবী অন্য ¯^াধীনতার কথাটি সব্যসাচী বলে এভাবে, ‘এই পরিবর্তনশীল জগতে সত্যোপলব্ধি বলিয়া কোনো নিত্যবস্তু নাই| তাহার জন্ম আছে মৃত্যু আছে| যুগে যুগে কালে কালে মানবের প্রয়োজনে তাহাকে নতুন হইয়া আসিতে হয়| অতীতের সত্যকে বর্তমানে ¯^ীকার করিতে হইবে এ বিশ্বাস ভ্রান্ত, এ ধারণা কুসংস্কার|’ উপন্যাসের বক্তব্যগুলোকে অতিক্রম করে নতুন দিনের ¯^প্নকে লালন করেছে| মানুষের সহজাত অনুশীলনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| অন্য সমস্ত চিন্তা যা ¯^াধীন হতে শেখায় না, প্রতিবাদ করতে শেখায় না, নতুন জীবন কামনা করে না সব্যসাচী তাকে প্রত্যাখান করেছে| সমস্ত বন্ধন শৃঙ্খলকে ভেঙে ¯^াধীন জীবনবোধের কামনা শরৎচন্দ্র এখানে করেছেন| পুরোনো সংস্কারকে পোড়ার আগুন তিনি জ্বালিয়ে দেন নতুন দিনের আলোর তাগিতে| ব্রিটিশ শক্তির প্রতি যে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে তা দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কের নিগড়ে সাড়া জাগানোই ছিল তার উদ্দেশ্য| তিনি সমগ্র উপন্যাসে যে কাজটা করেছেন মানুষকে সমূলে নাড়া দেওয়া, ঠিক এখানেও তাই করেছেন| অন্য সব উপন্যাস রাজশক্তির কোপানল থেকে মুক্তি পেলেও পথের দাবী সে পথ উপেক্ষা করে বাঁচতে পারেনি| মানুষের চেতনালোকে যে আলো জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার আগুন ব্রিটিশকে প্রথম পুড়তে চেয়েছিল| ইংরেজ সরকার তাই সেটি বাজেয়াপ্ত করে| এ উপন্যাস রচনার সমসাময়িক কালে ‘বর্তমান রাজনৈতিক প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘দেশসেবা জিনিষটা যতদিন ধর্ম হয়ে না দাঁড়ায় তার মধ্যে খানিকটা ফাঁক থেকে যায়| এ কথা আমি প্রতিদিন মর্মে মর্মে অনুভব করি| আবার ধর্ম যখন দেশের মাথা ছাড়িয়ে ওঠে তখনো ঘটে বিপদ|’ দেশপ্রেম সম্পর্কে তাঁর এ ধারণা আমাদের উজ্জীবিত করে| নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষের রাষ্ট্রে সকলে যদি দেশসেবাকে ধর্ম না মনে করে তাহলে রাষ্ট্রের সার্বিকতার যে বিচ্যুতি ঘটে তা এখন বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই দেখা যায়| ¯^দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং তার জন্য যে একজন ¯^দেশ প্রেমিককে কত বড় ঔদার্যের অধিকারী হতে হয় এবং তার জীবনে কত দুঃখ-লাঞ্ছনা থাকে তা তিনি দেখিয়েছেন এ উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যদিয়ে| তিনি অগ্নিযুগের বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেছেন সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে| সমাজবিকাশের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের যে প্রস্তুতির কাজটি শরৎচন্দ্র প্রমুখ সাহিত্যকরা করেছিলেন বর্তমানেও তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে| সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্বব্যাপী যে আগ্রাসন তা থেকে আত্মরক্ষা করে চলার জন্য পথের দাবী আমাদের চেতনাকে শাণিত করে| নতুন পথের সন্ধান দেয়| পৃথিবীকে দেখার আলো যেমন জোগায় তেমনি নিজেদের শক্তিমান হতেও শেখায়|