শওকত ওসমানের হন্তারক

শওকত ওসমানের হন্তারক : আওরঙ্গজেব ও দারা প্রসঙ্গ

-তাহা ইয়াসিন

বাংলাদেশের কথা সাহিত্যে শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮) এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সংকটন-সম্ভবনার ইতিহাস অভিব্যঞ্জিত হয়েছে তাঁর কথাসাহিত্যে। আজীবন তিনি ছিলেন প্রগতিশীল মন- মানসিকতার অধিকারী। এজন্য বরাবরই তিনি ছিলেন দেশ-কালের সাথে ঘনিষ্ট সূত্রে আবব্দ। পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা জন্মগ্রহন করলেও বাংলাদেশ হয়ে ওঠে তাঁর স্বদেশ।বাংলাদেশের উত্থান-পতনে সক্রিয়ভাবে তিনি নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্বে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি গল্প- উপন্যাস রচনা করেন। পাকিস্তান আমলে সামরিক জান্তা আইযুব খানের স্বৈরশাসনের প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তিনি রচনা করেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’ নামক উপন্যাস। আরব্য রজনীর গল্প থেকে সংগৃহীত হওয়ার এক গল্প উত্থাপন করে, তিনি বাগদাদের, খলিফা হারুন-অর-রশীদের, নিষ্ঠুরতার কাহিনী ওই উপন্যাসে তুলে ধরেন। অত্যন্ত, নাটকীয় উপস্থাপনে মনোজ্ঞ উপন্যাস ক্রীতদাসের হাসি বাংলা কথাসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তিনিঅনেকগুলো গল্প-উপন্যাস রচনা করেন। সেসব গল্প উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার চিত্র বাংলাদেশের পাঠক সমাজকে দেশপ্রেমের মর্মস্পর্শী চেতনার সঞ্চার করে। সমাজ-সমকালকে নিয়ে রচিত তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলো আঙ্গিক স্বাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। তার সাহিত্য জীবনের বয়স প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল। এই সময় পরিসরে তিনি পনেরোটি উপন্যাস ছাড়াও শতাধিক গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, স্মৃতিকথা প্রভৃতি লিখেছেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বের শেষদিকের সিংহাসনের উত্তরাধিকার হওয়ার নিষ্ঠুর লড়াইয়ের মূল চরিত্র দারাও আওরঙ্গজেবের কথোপকথন নিয়ে রচিত ‘হন্তারক গল্পটি। এটি একটি গল্পই তবুও আলাদা পুস্তক হিসাবে লেখক নিজেইপ্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘ বক্ষ্যমান গল্পটি অন্য গল্পের সঙ্গে যাওয়া বিধেয় নয়, এককভাবেই এটি পুস্তককারে, প্রকাশিত হওয়া উচিত। পেছনে যুক্তি: ইতিহাস, কাল এবং অস্তিত্বের সমস্যার ঘোঁট পাকানো গল্পটি চরিত্রে স্বতন্ত্র। সুতরাং স্বতন্ত্র বই।’ ১ এটি বই আকারে, প্রথম প্রকাশিত ১৯৯১ সালে এবং উৎসর্গ করে চিত্রশিল্পী জিলানী ওসমান এর পূর্ণ স্মৃতির উদ্দেশে। গল্পের শুরু সতেরো শতকের শেষ পর্যায়ে কাল রাত্রির তৃতীয় প্রহর অকুস্থল দিল্লি নগর মোগল রাজ প্রাসাদের অলিন্দে। খোজা প্রহরীদের পদচারণা শুধু স্তব্ধতা-বিরোধী। নচেৎ চারদিক নিশুত। খোজা প্রহরী খেজু এবং হিজুর কথোপকথন। তারা পরস্পর নিজেদের জীবনের সুখ-দুঃখের, আলাপ করে। হিজু প্রশ্ন করে, তোর ছেলেবেলার কথা মনে আছে?গেজু সামান্যক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মুখখোলে , “আমি মাঝে মাঝে একটি স্বপ্ন দেখি একটি নদীর।নদীর নামটা মনে আছে ইলিশবিল। “আর কিছু মনে নেই। তারপর ?“আর কিছু মনে নেই। আর কিছু দেখি নি।” সহকর্মীর চোখে চোখ রেখেছিল হিজু এবার বলে “আমাকে কেল্লার ভেতর দুজনে হাজামের কাছে ধরে রেখেছিল। তখন আমি খুব কাঁদছিলুম। “হাজাম অথ ক্ষৌরকার। বালকদের খোজা বানানোর শল্যবিদ বিশেষ।’২

সারা ভারতবর্ষের গ্রাম-গঞ্জ থেকে মোগল দরবারে বালকদের নিয়ে যাওয়া হতো। দরবারে স্থায়ী পাহাড়াদার কিংবা হেরেমের কাজের জন্য জন্য রাখা হতো এদের । খেয়ে পরে সারাজীবন এরা বেঁচে থাকাতো নপংশুক হিসেবে। দুই খোজার জীবনের গল্পের পরেই শুরু হয় মূল কাহিনী দারা ও আওরঙ্গজেবের আলাপচারিতা ।আখ্যায়িকার প্রবেশের জন্য সময়কালকে ধরতে গল্পকার সালের, উল্লেখ করেন। ‘১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃতু হয়.। তার আটচল্লিশ বছর পূর্বে ১৬৫৯খ্রিষ্টাব্দে কাজীর বিচারে ধর্মদ্রোহিতার শাহজাদা দারাশুকোর (মত্যন্তরে শিকো) শিরচ্ছেদ ঘটে।’৩কাজীর বিচারে দারার শিরচ্ছেদ করা হয়েছিলআওরঙ্গজেবের আদেশে। কেননা আওরঙ্গজেব বৃদ্ধ স¤্রাট শাহাজাহানকে প্রাসাদ অন্তরীন এবং বিচারের নামে প্রহসন করে দারার শিরচ্ছেদ করেন। মোগল ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনাকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে হন্তারক গল্পটি।

আওরঙ্গজেব ও দারা মোঘল স¤্রাটদের কবরসহ বিভিন্ন স্মৃতিময় স্থানগুলোতে গিয়ে পারস্পারিক আলাপচারিতা করেন। এই আলাপে মানব জীবনের সত্যিকার মুক্তির কথা ওঠে এসেছে।

কালের নির্মম থাবায় আলিসান ইমারতওধ্বংসস্তপ পরিণত হয়। ইমারতেরভেতরে বাস করা রাজা-বাদশাহ মিশে যায় মাটিতে। কাল নিরবধি হয়ে থাকে তাদের কৃর্তি। মহাকাল রাখে ওই কৃর্তিটুকুই। দিল্লির অদূরে যমুনা নদীর প্রবাহ দিক পরিবর্তন করেছে অনেক কিন্তু মোগল স্মৃতি তাজমহলসহ আরো বহু প্রাসাদ এবং প্রাসাদের ভগ্নস্তপ এখনো আছে। সেরকমই ভগ্নস্তুপে আওরঙ্গজেব ও দারা উপস্থিত হয়ে পরস্পরে কথোপকথান কারে। ‘আমাদের লক্ষ্যস্থল উনিশ শতকের অর্ধভাগ পেরিয়ে প্রাচীন অট্টালিকার একটি ভগ্নস্তুপ। কালের হিসাব অখ্যায়িকার, উন্মোচনই স্পষ্ট বলে দেবে। ভুগ্রস্তপের একাংশে দেখা যায়, অনেকখানি সমতল চত্বর বেশ ফাঁকা। চতুর্দিকে ইমারতের ভাঙ্গাচোরা দেওয়ালের দশা ঠিক ভগ্নজান প্রহরীর মতো। সটান নয় সর্বক্ষেত্রে।’৪এই ভগ্নস্তূপের ফাঁকা চত্বরে চাঁদের আলোয় দুটি ছায়ামূর্তি পায়চারি করে কথা বলে। একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করে, আপনি কে? তারপর কথোপকথন। আওরঙ্গজের নিজের নাম জানান ‘আওরঙ্গজেব’ বলে। কিন্তু ‘দারা বিদ্ররূপ মাখা হাসি ছিটিয়ে বলেতুমি ‘তো আবুল মোজাফফর মহীউদ্দিন মুহম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীর বাদশাহ গাজী… উঃ একবার নাম উচ্চারণের পর এক কুঁজো পানি ঢালতে হবে গলায়।’’ ‘‘তুমি তাহলে দারা? আর খটকা নেই। এখনও তোমার ক্ষোভ যায়নি?’’ ‘‘হ্যাঁ ,আমি দারা শুকো। এটুকু উচ্চারণে গলা ভেজানো দরকার হয়, না ।’’ আওরঙ্গজেব এবার হাত বাড়িয়ে দিতে বলে,‘‘আহ দারা। যেমন ইহলোকে তেমনই পরলোকে আমার প্রতি তোমার হিংসে আড়ি কিছুই যায়নি দেখছি। এসো, এসো। হাতে হাত মেলাই।’’৫চাঁদের আলোর দুই সহোদর হাত মেলায় যারা সিংহাসনের উত্তরাধিকার সংগ্রামে প্রতিদ্ব›দ্বী ছিল। আওরঙ্গজেব দারাকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে কাজীর বিচারে দারার শিরচ্ছেদ হয়েছে। সত্য সকলে জানলেও জানেনা আওরঙ্গজেব। অর্থাৎ যারা ক্রুর এবং মিথ্যার উপর টিকে থাকে তারা কখনোই জানেনা যে তাদের পথ ভুল। তারা তাদের মতোই সবসময় সবাইকে ভাবে। সেই পুকুরে গোসল করা গল্পের মতো, ফজরের আগে একটু অন্ধকার অন্ধকার, থাকে। একটু দুরের মানুষের চেহারা মানবাকৃতি বোঝা গেলেও পরিষ্কার চেনা যায় না। তখনো সূর্যের আলো রাতের অন্ধকার ভেদ করে ফজরের উজ্জ্বলতা পায়না। এমন সময় একটা পুকুরের দুই পাড়ে দু’জন লোক গোসল করতে আসে। একজন সারারাত জেগে চুরি করে এসেছে, গোসল করে, ঘুমাবে। আরেকজন গোসল করে, ফজরের নামাজ পড়বে। নামাজি ভাবে, যাক মসজিদে আজ তাহলে আরেকজন মুসল্লি বাড়বে। আর চোর ভাবে এই এলাকায়, তাহলে আমার মতই আরো চোর আছে। আওরঙ্গজেব দারাকে ভাবুকতা দার্শনিকতা ছেড়ে দিতে বলে। কেননা এই ভবুকতা দার্শনিকতার কারনেই নাকি আওরঙ্গজেবের কাছে তিনি হেরে গেছেন। দারা দার্শনিক ছিলেন, ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। ঐতিহাসিকদের মত, যদি শাহজাহানের পর দারা সিংহাসনের অধিকারী হতেন তাহলে মোগল সম্রাট আকবরের(১৫৫৬-১৬০৫)মতো সম্প্রীতিময়, হতো ভারতবর্ষ । কিন্তু কুটকৌশলী আওরঙ্গজেব সকল ভ্রাতাকে হত্যা এবং পিতা, ভাগনীকে অন্তরীণ করে ক্ষমতা দখল করে। আওরঙ্গজেব দুই যুগের, বেশী সময় ক্ষমতায় থাকে। আওরঙ্গজেবের পরপরই মোগল সাম্রাজ্যেরক্ষয়িষ্ণুতার সুচনা এবং ব্রিটিশ বেনিয়াদেরআগমন ঘটে। গল্পের সাক্ষাতে আওরঙ্গজেব আবারো বোঝাতে থাকে দারার শিরচ্ছেদ সমাজের বিধান ও শৃঙ্খলার কারনেই হয়েছে। এই কথার প্রতিত্তোরে দারা পশতু ভাষায় এক প্রবাদের কথা শোনায় আওরঙ্গজেবকে। ‘খো বদেরা বাহানা বেশিয়ার’৬ ‘(মানে বদ-লোকের বাহানা বহু।’ আওরঙ্গজেব তারপরও বোঝাতে চায়, সমাজের শৃঙ্খলা ও বিধানের জন্যই দারার শিরচ্ছেদ হয়েছে। দারা সাধুসন্তদের, ভাষা শিখেছিল এবং তাদের সাথে মিশে এদেশীয় কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে জেনেছিল এসবই তার অপরাধ বলে উল্লেখ করে আওরঙ্গজেব। মোগল আমলের প্রায় পাঁচশত বছরের শাসনকালে সমস্ত শাসকগণই ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত। তারা কেহই ভারতবষের্র মাটির সন্তান ছিলেন না। মোগল আমলে ভারতবর্ষে নানাবিধ সমৃদ্ধি ঘটলেও তারা হিসেবে ছিলেন বিদেশি। সে কারনেই সিরাজদ্দৌলার পতনের পর হিন্দুরা ইংরেজদের ওয়েলকাম করেছিল। তারা মোগল শাসকদের চেয়ে এগিয়ে থাকা জাতি হিসেবে ইংরেজদেরআগমন প্রত্যাশা করে। মোগল সম্রাট আকবর এদেশীয়দের সাথে অন্তরঙ্গ হয়েছিল এবং তিনি সকল ধর্ম-বর্ণের, মানুষকে এক দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। দারার মধ্যেও আকবরের গুণ ছিল। দারা এদেশীয়দের সাথে মিশে ভারতীয়, দর্শন ও চিন্তা-চেতনার সুপÐিত হয়েছিলেন। শাহাজাহানের জ্যৈষ্ঠপুত্র হিসেবে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হওয়ার কথা ছিল দারারই। কিন্তু আওরঙ্গজেব ষড়যন্ত্র এবং কূটকৌশলে দারাকে ওভারটেক করে, ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখলের পরই হত্যা করে একে একে অন্যান্য সকল ভ্রাতাকে। দারাকে হত্যা করেন শেষে সেকারনে এই হত্যাকান্ডে কেপে উঠেছিল আওরঙ্গজেবের হৃৎপিন্ড। আওরঙ্গজেবের কথা শোনার পর অপর ভ্রাতা মুরাদের প্রসঙ্গ স্মরণ করে দিলে বলে, ‘শুনে যাও। কান খোলা রাখো। শরীয়তে শরার পান হারাম নিষিদ্ধ। তুমি মুরাদকে বন্দী করার মতলবে কুজো শরাব আর টাকা পয়সার ঘুস সরবরাহ করোনি? তোমার শরীয়ত মানে ষড়যন্ত্র। কথা বাড়িও না, আওরঙ্গজেব। তোমার তিন বছর পূর্বে জন্মেছিলুম। তাছাড়া দুঃখ কষ্টের ভেতর দিয়ে আমার জীবনের পরিচয় স্পষ্ট। খো বদেরা বাহানা বেশিয়ার।’ ৭

উভয়ের মাঝে তপ্ত বাতাস বয়ে যায়। আওরঙ্গজেব বোঝাতে চায় রাজ্য চালানো সম্পর্কে। রাজ্য চালাতে হলে অনেক কুটকেীশল প্রয়োজন হয় যা দারার মাঝে নেই। দারা রাজ্য চালাতে পারতোনা বলে উল্লেখ করে আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজের স্বীকার করে দাবার মতো তার পান্ডিত্য নেই কিন্তু পÐিতদের সাথে তার যোগাযোগ আছে। রাজ্য চালানো একপ্রকার ধূর্ততার কাজ বলে আওরঙ্গজেব উল্লেখ করে। এ প্রসঙ্গে সে মহাভারত থেকে একটা উদাহরণ শোনায় দারাকে ‘ব্যাধগণ যেমন পক্ষীদের স্বর অনুকরণ করিয়া তাহাদের বশীভূত করে, নরপতিও তদ্ররূপ শত্রæগণের সহিত আত্মীয়বৎ ব্যবহার করিয়া তাহাদের বিনষ্ট করিবেন। অরাতিকে পরাজয় করিয়া নিয়ত নিশ্চিত থাকা উচিত নহে দুরাত্মার চটৎকুশীল বহ্নির ন্যায় সদা-জাগরিত থাকে’।৮ আওরঙ্গজের আরো বোঝাতে থাকে। মোগল তৈমুর বংশের কলঙ্ক হিসেবে দারাকে অভিযুক্ত করে। মহলের সংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য দারা বিধর্মী ওস্তাদ নিয়োগ দিয়েছিল যা আওরঙ্গজেব ধর্ম নষ্ট হিসেবে নিয়েছিল। সংগীতের শব্দে ও সুরের মানে আওরঙ্গজেব জানে না বলে দারা বলে। শব্দের ভেতর প্রেমের চেয়েও কত গভীর আনন্দ আছে যা কোনোদিনই আওরঙ্গজেবের কানে সেঁধোবে না। শব্দের মহাত্ব জানবে না আওররঙ্গজেব। দারা আওররঙ্গজেবের উদ্দেশ্য বলে সে শুধু জানে মনসবদারের ঘোড়ার জন্য কত ছোলা দরকার হয়। আওররঙ্গজেব জানায় ফকির সারমাদ এর কথা,যেফকির শহরের পথে পথে ‘ লা ইলাহা, লা ইলাহা‘ বলে বেড়াতেন। কলেমার বাকী অংশ শুনতে না পেয়ে কাদীর বিচারে তার শিরচ্ছেদ করা হয়। সেই কাজীই দারার শিরচ্ছেদ করা রায় দিয়েছিল। দারা এসব প্রসঙ্গ উপস্থাপন করে। করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভ্রাতার মুখপানে দারা।

দারা আওরঙ্গজেবকে মামনসুর নিয়ে যায় এবং তাকে অনুসারন করতে বলে।জায়গাটা স¤্রাট হুমায়নের কবর (স্মৃতিসৌধ) আওরঙ্গজেব প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে চেনে। কবরস্থানে তৈমুরসহ অন্যান্য মোগল সম্রাটদের করবও রয়েছে। পূর্ব-পুরুষদের সাথে কবরস্থানে তারা কথা বলে। এই কবরস্থানেই সিপাহি বিদ্রোহের সময় মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ ও শাহজাদাগন ইংরেজদের হামলায়, নাস্তানাবুদ হয়ে দিল্লির পতনের দুইদিন আগে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ইংরেজ গুপ্তচর উইলিয়াম স্টিফেন রাইকেশ হাডসন আত্মগোপনের সংবাদটি জেনে পঞ্চাশজন সিপাহিসহ তাদের গ্রেফতার করার জন্য উপস্থিত হয়। বাহাদুর শাহ প্রাণরক্ষার প্রতিশ্রæতি পেয়ে বেরিয়ে আসেন। সমাধি থেকে বেগম জীনৎ মহল ও তাদের ছেলে জওয়ান বখতসহ ধৃত হয় হাডসনের কাছে। বাকি বাদশাজাদাদের বন্দী করার জন্যসৈনাবাহিনী নিয়ে আক্রমন চালায় এবং তিন হাজার সৈন্যসহ তাদের আটক করে। হাডসন নিজহাতে বাহাদুর শাহ’র তিনপুত্র, শাহজাদা মির্জা মোগল, মির্জা খিজির সুলতান এবং নাতি মির্জা বাকেরকে গুলি করে মেরে ফেলে। বন্দি সৈন্যদের প্রথমে কাপড় খুলে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তারপর মেরে ফেলা হয় ক্রশ ফায়ার করে।আওরঙ্গজেব নির্বাক হয়ে যায় এই ভেবে যে তারা কেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। দারা জানায় বাহাদুর শাহ কবিও ছিলেন, লিখতেন কবিতা, আবৃত্তি করে, দারা,

 

হায়াৎ দারাজ মাং

করহায়াৎ ¯্রফে চারদিন

দো আরজু মে

দে ইন্তেজার মে কাট গ্যায়।

পেয়েছিলুম ¯্রফে চারদিন আয়ু দুইদিন কেটে গেল আবেদন নিবেদনে। দুইদিন তিতিক্ষায় প্রতীক্ষায়। “থু”।” করে, আওরঙ্গজেব মুখ থেকে থুথু নিক্ষেপ করেন। তার মতে এসব তো কমজোকমজাত (বেজন্মা) বুজদীলের জন (কাপুরুষের) কবিতা। আওরঙ্গজেব মুখ থেকে থুথু নিক্ষেপ করেন। আওরঙ্গজেব উত্তেজিত হয়ে ওঠে এজন্য তৈমুর বংশের এমন কলঙ্কজনক পরাজয়!

এরপর দারা আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যায় বিস্তৃর্ণ প্রান্তরে যেখানে ঝর্ণা, ফুলের সৌরভ, প্রকৃতি-নির্মিত পাথরের বেদী, গাছপালার আবেষ্টনীতে সুশীতল পরিবেশ। জায়গাটা সুন্দর; যেখানে বাদশা বাবুর বলতে পারতেন,

 

ফিরদৌস গার রুয়ে জমিনাস্ত

হামি নাস্ত ওয়া হামি নাস্ত ওয়া হামি নাস্ত

পৃথিবীতে স্বর্গ যদি থাকে কোন স্থানে৯তা এইখানে। তা এইখানে। দারা একটি গাছে হেলান দিয়ে আওরঙ্গজেবকে প্রশ্ন করে ‘‘ সৃষ্টার সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টি এই দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি? ১০স্রষ্টার সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা হয় না বলে জানায়, আওরঙ্গজেব। দারা জানায় মানুষ নির্মাণ করে, মসজিদ মন্দির, আল্লাহ সৃষ্টি করে মানুষ। মানুষ হত্যা করা মসজিদ, মন্দির ভাঙ্গার চেয়েও বড় গুনাহ। সায় দেয়, আওরঙ্গজেব। দারা জানায়, ‘এসবের পরিণাম কি তুমি জানো? লাহোরে, তুমি যে মসজিদ বানিয়েছিলে, শিখ নেতা রঞ্জিৎ সিং এর রাজত্বের কালে তা বারুদখানা বানিয়েছিল। আর আমার তৈরী লাহোরের চকবাজার, এখনো হাজার হাজার নরনারীর প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা মেটায়-যার ভেতর দিয়ে অর্থ জীবনের একটা কাঠামো গড়ে ওঠে। জীবনের অর্থ খুঁজে পায় হাজার নরনারী ‘১১উত্তেজিত আওরঙ্গজের উঠে দাঁড়ায় এবং জানায় তার সঙ্গে কোথাও বিশ্রামও পাওয়ার উপায় নেই। দারা জিজেস করে সে কোনো শব্দ শুনতে পায়, কিনা। অন্য কোথাও তারা যেন চলে গেছে। নিকটে যমুনা নদী জলের কল্লোলিত ধ্বনি পায়। আওরঙ্গজেব আন্দাজ করে হয়তো নীড়ের কাছেই তারা। কিন্তু একটা গায়েরী আওয়াজ প্রতিনিয়ত শোনা যেতে থাকে, ‘আমি জারজ, বেজন্মা, হারামজাদা তাই ভ্রাতৃঘাতী, নারীঘাতী, জননী-ভগিনী- ধর্ষক … অজাচারী… জঘন্য ঘৃণাআওরঙ্গজেব শশব্যস্ত দারাকে প্রশ্ন করে ” কে এই চিৎকার গায়েবী চিৎকার দিচ্ছে ?গায়েবী আওয়াজ হতে থাকে প্রতিনিয়ত। মানুষের বাঁচার শর্ত থাকে আলো-অন্ধকারে মতো দুই জমজে, তার বিপরীত, উল্টা, এই পাল্টা-উল্টোর বাঁচার শর্ত। মনের ভেতর তার, বুদ্বুদ-ভুড়ভুডি ওঠে প্রতি নিয়ত- গল্পকার জানায়একথা । তারপরও দুজনের কথা চলে আরব জাহানের শূন্য আবিষ্কার ইত্যোকার। কিন্ত আওরঙ্গজেব জারজ শব্দটা শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। দারা তখন এই শব্দে উত্তেজিত না হওয়ার কথা বলে একটা কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আওরঙ্গজেব, জারজ-শব্দে তুমি এমন চেতে উঠছ কেন? বিজাপুরের বাদশা আদিল শা’র মৃত্যুর পর তার ছেলে সিংহাসনপ্রার্থী হলে তুমি কি সম্রাট’ শাজাহানকে লেখোনি প্রার্থী আদিল শা’র ঔরসজাত সন্তান নয়। সুতরাং বিজাপুর মোগল সাম্রাজ্যের অন্তভূক্ত হওয়া উচিত ?লেখোনি তুমি?১২ এঘটনা রাজ্য চালানোর ব‍্যাপার বলে জানায়, আওরঙ্গজেব।

দারা জানায় কোতওয়াল, চর, বরকন্দাজ ঔ বা এই মাতায় কর্মচারীরা ছোট ছোট গরীব বালকদের নানা কৌশলে ধরে এনে হেবু গেবু গেজু হিমু নাম দিয়ে খোজা বানিয়ে রাখা হয় প্রাসাদে।‘ফতোয়ায়আলমগীরী’ খুব প্রসিদ্ধ হলেও এই খোজাদের, কোনো ফতোয়া দেননি ধার্মিক প্রবর আলমগীর। খোজা করে মাত্র একটি পুরুষকে বেজন্মা জারজ জন্ম দেয়া থেকে বিরত রাখা যায়, কিন্তু অন্য কেউ দুষ্কর্ম করতে চাইলে ওদের সাহায্যে করার সুযোগের অভাব হয় না। ফলে যে পথে পুত্রের নির্গমনের কথা সেখান দিয়ে, হয়তো ভ্রাতুপুত্র বেরুবে বা অন্য সুবাদের কেউ।‘ উত্তেজিত, আওরঙ্গজেব আরও নানা প্রসঙ্গে কথা বলে কিন্তু গায়েবী আওয়াজ বন্ধ হয় না। আমি আমি জননী, ভগিনী, ধর্ষক নারীঘাতী, নরঘাতী, ভ্রাতৃঘাতী তাই আমি জারজ বেজন্মা অত্যাচারী জঘণ্য…ঘৃণ্য, ঘৃণ্য। মোগল শাসনের এক নিষ্ঠুরতম ঘটনাপ্রবাহে নির্মিত গল্পটি ধ্বনি তরঙ্গ- পল্লবিত হয়ে সমাপ্ত হয়।

 

তথ্যসুত্র:

১. শওকত ওসমান, হন্তারক, সময় প্রকাশক, দ্বিতায় মুদ্রণ-২০২০ ৩৮/২ক বাংলা বাজার, ঢাকা।

২. পূর্বোক্ত: পৃ: ১১

৩. পূর্বোক্ত: পৃ: ১৫

৪. পূর্বোক্ত: পৃ: ১৭

৫. পূর্বোক্ত: পৃ: ১৮

৬. পূর্বোক্ত: পৃ: ১৮

৭. পূর্বোক্ত: পৃ: ১৯

৮. পূর্বোক্ত: পৃ: ২৫

৯. পূর্বোক্ত: পৃ: ৩৪

১০. পূর্বোক্ত: পৃ: ৩৫

১১. পূর্বোক্ত: পৃ: ৪০

১২. পূর্বোক্ত: পৃ: ৪৩