কবি নীবর কেন

ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি

‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি ‘
      —– তাহা ইয়াসিন
*****************************
বাংলাভাষী সকলের পরিচিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম(১৮৯৯ – ১৯৭৬) তাঁর সাহিত্য জীবন ২২/২৩ বছরের (১৯২০-১৯৪২) । তিনি ১৯৪২ সালের পর চিরতরে বাকরুদ্ধ হয়ে যান । এরপরেও ৩৪ বছর বেঁচেছিলেন । শেষদিকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। এরপর থেকে তিনি ছিলেন ঢাকায় । ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবির কনিষ্ঠ পুত্র  কাজী অনিরুদ্ধ মারা যান। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। সে বছরই তাঁকে একুশে পদকও প্রদান করা হয়। নজরুলকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি ‘ হিসেবে সন্মানিত করা হয়।
১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই তাঁকে অসুস্থু সন্দেহে ঢাকার পিজি হাসপাতালের ১১৭ নম্বর কেবিনে ধানমন্ডিতে তাঁকে রাখা বাড়িটি থেকে নিয়ে আসা হয়। প্রায় বলপূর্বক জড়বৎ নজরুলকে হাসপাতালের ছোট্ট রুমটিতে বদ্ধ করে রাখা হয়।  দশ মাস থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, রবিবার সকাল ১০ টায় ওই কেবিনেই মারা যান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অনেকেই এটাকে অসুস্থু, বাকরুদ্ধ মানবপিন্ডাকারের নজরুলের শেষ কারাগার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জীবিত নজরুলের জীবন নানা ট্রাজেডিপূর্ণ।
নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬২ সালে। তাঁকে নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়ায় কবরস্থ করা হয়। তাঁর কবরের পাশে নজরুলের কবরের জায়গা রাখা হয়েছিল কিন্তু নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি ও মসজিদ প্রাঙ্গনে কবরস্থ করা হয় । ফুলের জলসায় সেখানেই নীরব হয়ে আছেন আমাদের প্রিয় কবি।
  নজরুল ছিলেন মুলতঃ কবি। নজরুল কবিতা ছাড়াও গান, গল্প,উপন্যাস, নাটক এসবও লিখেছেন। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা তিন হাজারের অধিক। কবিতার বই বিশটির বেশি। উপন্যাস তিনটি। গল্পের বই তিনটি। অনুবাদ বইও  আছে তিনটি। এছাড়া শিশুদের জন্যও বেশ কয়েকটি কবিতার বই রয়েছে। তাঁর গানগুলো নানা শ্রেণির। যেমন অনেক গান আছে যেগুলোতে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। সেগুলোকে বলা হয় দেশাত্মবোধক গান। ‘ রূপে অপরূপ হেরিনু তোমায়, ওরে ও পল্লী জননী ‘, ‘আমার দেশের মাটি ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি ‘। এরকম অনেক মমত্ব ছড়ানো গান রয়েছে তাঁর। কিছু গান আছে বিদ্রোহাত্মক। তাঁর জীবনকালে আজকের ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে ছিল ভারত উপমহাদেশ। পুরোটাই ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন। ১৭৫৭ সালে পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দোলাকে পরাজিত ও হত্যা করে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশে তাদের শাসন বিস্তার করে। এরপর অনেকে ব্রিটিশ শাসন মেনে নিয়ে তাদের সহযোগীতা করে। আবার অনেকে ইংরেজদের দ্বারা শোষিত-বঞ্চিত এবং অত্যাচারিত হয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা প্রতিবাদ করে। ভারত উপমহাদেশের নানা প্রান্তে ইংরেজের বিরুদ্ধে ছোটো ছোটো  বিদ্রোহ এবং খন্ড যুদ্ধে বহু মানুষ জীবন দেয়। এভাবে শতাধিক বছর চলে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম। এই সংগ্রামগুলোর মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষের মাঝে স্বাধীনতাবোধ জাগ্রত হয়।  নজরুল যখন কবি হিসেবে কলকাতায় পরিচিতি লাভ করেন সেই ১৯২০ সালের দিকে ইংরেজ শাসনের তখন পৌনে দু’শো বছর হয়ে গেছে। ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ তখন একটা প্লাটফর্মের রূপ লাভ করে। কবিতা ও গানের মাধ্যমে তখন দিকে দিকে ছড়িয়েও পড়ে এই বিদ্রোহী স্বাধীনতার মূল্যবোধ । কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর নজরুলও অত্যন্ত জোড়ালো ভাষায় ইংরেজবিরোধী অনেক গান রচনা করেন। সেসব গানকে বলা হয় বিদ্রোহাত্মক গান।
 ‘ কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’, ‘শিকল পরার ছল মোদের এই শিকল পরার ছল,
 ‘ উদার ভারত! সকল মানবের / দিয়াছ তোমার কোলে স্থান।
পার্সী-জৈন -বৌদ্ধ -হিন্দু / খ্রীস্টান -শিখ – মুসলমান। ‘ এরকম আগুন ছড়ানো অনেক বিদ্রাহাত্মক গান রয়েছে  তাঁর।
তিনি স্বদেশী ও বিদ্রোহাত্মক গান-কবিতার পাশাপাশি  মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমের গান ও কবিতা  লিখেছেন। তাঁর প্রথম কবিতার বই অগ্নিবীণার ‘ বিদ্রোহী ‘ কবিতাটিতেই তিনি বলেছেন ,
‘ মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তুর্য!’
তিনি একই সাথে প্রেম ও বিদ্রোহের কবি ও গীতিকার।’মোর প্রিয়া হবে এসো রানী / দিব খোঁপায় তারার ফুল ‘, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় ‘ প্রভৃতি।
তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় গজল রচনা করেন। গজলগুলোতে তিনি প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে মধুর সুরারোপ করেন।
”বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনা আজি দোল’,  ‘ কে বিদেশি বন উদাসী বাঁশের বাশী বাজাও বনে’, প্রভৃতি গজলে মর্মস্পর্শী সুর সংযোজন করেন তিনি।
বাংলা আধুনিক গানের যাত্রা নজরুলের হাতেই।
তাঁর লেখা প্রেমের গানগুলোও অসাধারণ,
 ‘তোমারই আঁখির মত আকাশের দুটি তারা / চেয়ে থাকে মোর পানে নিশীথে তন্দ্রাহারা। সে কি তুমি? সে কি তুমি? ‘, ‘ দিনের সকল কাজের মাঝে /তোমায় মনে পড়ে, আমি কাজ ভুলে যাই মন চলে যায় /সুদূর দেশান্তরে /তোমায় মনে পড়ে। ‘ প্রভৃতিতে মানব-মানিবীর প্রেমের চিরন্তন রূপ পরিস্ফুটিত।
বিদেশি (কিউবান) নাচের সুরে সুরেও তিনি গান রচনা করেছেন,  ‘ দূর দীপ বাসিনী চিনি তোমারে চিনি /দারুচিনির দেশের তুমি বিদেশিন্যি গো / সুমন্দভাষিণী। ‘ অনেকেরই শোনা আছে এগান। নানা দেশের গানে তিনি সুরারোপ করে সেগুলোকে বাংলার সবুজ-শ্যামলিমার সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন।
এছাড়াও নজরুল ইসলামী গান হামদ, নাত যেমন রচনা করেছেন তেমনি শ্যামাসংগীত, রাগপ্রধান গান, ভাটিয়ালি, ছাদ পেটানোর গান, কোরাস গান, হাসির গান, মার্চ সংগীত বা সেনাবাহিনীর গানও রচনা করেন। গানের বিচিত্র ধরণ ও সুরের জন্য নজরুলের গানগুলো ‘ নজরুল সংগীত ‘ নামে পরিচিত। বাংলা গানের জগতে অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়। অর্থাৎ বাংলা গানে এই পাঁচ মহারথীর অবস্থান চিরন্তন। সকলে গানের ক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
নজরুলের সাহিত্য জগতও দেশাত্মবোধক। সাহিত্যকে তিনি সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের চিন্তাজগতকে নাড়া দেয়। সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে। বাংলা ভাষায় তাঁর মতো দ্রোহী সাহিত্য আগে ছিল না। তাঁর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় পদচারণা করলেও পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য তীব্র আকুলতা তৈরী করেনি । রবীন্দ্রনাথ যখন ১৯১৩ সালে তাঁর ‘ গীতাঞ্জলী’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন তখন নজরুলের বয়স ১৩/১৪ বছর। তিনি তখনো কবি হয়ে ওঠেননি। যখন নজরুল বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তখন রবীন্দ্রনাথ পৌঢ়ত্বে। তা হলেও নজরুল রবীন্দ্রনাথকে গুরু বলে সম্বোধন করতেন এবং  রবীন্দ্রনাথও তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বিদ্রোহাত্মক ও ঝাঁঝালো কবিত্বকে ভালোবাসতেন।
নজরুল তাঁর ‘ বিদ্রোহী ‘ কবিতায় পরাধীন ভারতবাসীকে মাথা উঁচু করে জেগে ওঠার আহবান জানান। ‘বল বীর –
        বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি নত – শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বিদ্রোহী চিরদুর্দম,দুর্বিনীত, নৃশংস। সে যেন মহাপ্রলয়ের নটরাজ সাইক্লোন ও ধ্বংসের ভয়াবহ মূর্তিতে আবির্ভূত।
বিদ্রোহী সেই দিন শান্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করে, ‘ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না / অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না। ‘
এই চিরজাগ্রত বিদ্রোহী ভারতবর্ষের সমগ্র মানুষ যারা পরাধীনতার শৃঙখলে আবদ্ধ। এরকম অনেক কবিতা সেদিন স্বদেশী আন্দোলনকারীদের স্বাধীনতার জন্য উজ্জ্বীবিত করে তোলে। নজরুল কবিতা দিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহন করেন।
কলমও যে রাইফেল, মেশিনগানের মতো দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্তির অস্ত্র হিসেবে কাজ করে নজরুলই তার উদারহরণ। শুধু কি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যই নজরুলের কবিতা অস্ত্রের মতো শক্তি দিয়েছিল? না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধাদের দারুণ শক্তি দিয়েছিল তাঁর জাগরণি গান। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে অস্থায়ী রেডিও সেন্টার খোলা হয়েছিল সেটার শুরুই হয়েছিল নজরুলের দেশাত্মবোধক গানগুলো দিয়ে। রণক্ষেত্রে যোদ্ধাদের অন্তরশক্তি দিয়েছিল নজরুলের কবিতা ও গান। আজো বাংলায় নিপীড়িত মানুষকে আন্দোলনে নামতে শক্তি যোগায় নজরুলের সেসব কবিতা ও গান। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর রণসঙ্গীত ‘ চল চল চল /উর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল / নিন্মে উতলা ধরণী তল / অরুণ প্রাতের তরুণ দল চলরে চলরে চল। ‘ নজরুলেরই রচনা।
নজরুল তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে আমাদের প্রাণস্পন্দনের সাথে মিশে আছেন।