-আলিয়া নেফারতিতি
“If you fail, never give up because F.A.I.L means ‘First Attempt in Learning’.”
ব্যর্থতা নিয়ে ইতিবাচক এই দৃষ্টিভঙ্গি এমন একজন ব্যক্তির যিনি সাধারণ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ। তিনি ছিলেন ভারতের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সহজ-সরল আর সাদামাটা জীবন যাপনই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। অত্যন্ত বিনয়ী এই মানুষটি তাঁর কাজের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । মৃত্যুবরণ করেন ২০১৫ সালে কিন্তু মানুষ আজও তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘উইংস অব ফায়ার’। তিনি ‘মিসাইল ম্যান’ নামে খ্যাত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি স্যার এ পি জে আবদুল কালাম।
ভারতের তামিলনাডুর দ্বীপ-শহর রামেশ্বরমের একটি মধ্যবিত্ত কিন্তু আদর্শ পরিবারে ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্যার এ পি জে আবদুল কালাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রামেশ্বরমে তিনি এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন যারা ছিলেন প্র্যাকটিসিং মুসলিম, তবে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্যার এ পি জে আবদুল কালামের বাবা জয়নুলাবদিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রামেশ্বরম মন্দিরের প্রধান পুরোহিত, পক্ষী লক্ষণা শাস্ত্রী। তাঁরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করতেন। এছাড়াও ‘মিসাইল ম্যান’ এর শৈশবে যে তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তাঁরা সবাই গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও একে-অপরের বাড়িতে তাঁদের অবাধ যাতায়াত ছিল। অর্থাৎ তিনি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছেন যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে – এই পরিচয়টাকে সবার ওপরে স্থান দেয়া হয়েছে। একটি দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের মাঝে বেড়ে ওঠায় সকল মানুষকে তিনি আপন করে নিতে পারতেন। তাঁর মানবিক মূল্যবোধ গঠনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রামেশ্বরমের এক সাধারণ স্কুলে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে স্যার এ পি জে আবদুল কালামের শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালীন তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সেন্ট জোসেফ কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে বি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর জীবনে এমন এক স্বপ্ন ছিল যা পূরণ করতে হলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে হবে। স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তিনি মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে Aerospace Engineering বিষয়ে যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর স্যার এ পি জে আবদুল কালাম Hindustan Aeronautics Limited এ প্রশিক্ষণ নেন।
প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করে এবার কর্মজীবন শুরু করার পালা। স্যার এ পি জে আবদুল কালাম সর্বপ্রথম চেষ্টা করেন বিমানবাহিনীতে যোগ দেয়ার। কিন্তু অল্পের জন্য তিনি ব্যর্থ হন। এতে কষ্ট পেলেও হাল ছাড়েননি এই প্রতিভাবান ব্যক্তি। তিনি Defence Research and Development Organization (DRDO) – এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়া Indian Space Research Organization (ISRO) – এ বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে তিনি কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। অবশেষে ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্যিক, দার্শনিকের অনুপ্রেরণামূলক উক্তি স্যার এ পি জে আবদুল কালামের কাজের স্পৃহা বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতো। তিনি সফলতা কিংবা ব্যর্থতায় এসব উক্তি স্মরণ করতেন।
“ভালোবাসা ছাড়া যে রুটি তৈরি করা হয় সে রুটি তিক্ত রুটি যা একজন মানুষের ক্ষুধা অর্ধেক মিটাতে পারে।” – খলিল জিবরান।”
অর্থাৎ যেকোনো কাজের সার্থকতা নির্ভর করে সেটির পেছনের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার ওপর।
১৯৭৯ সালে প্রথম SLV-3 উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়া তাঁর জন্য বড় ধরনের হতাশার সময় ছিল। কিন্তু এ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৮০ সালে ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট SLV-3 সফলভাবে মহাকাশে পাঠাতে সক্ষম হন। এছাড়াও অগ্নি, পৃথ্বী, আকাশ, ত্রিশূল – এসব মিসাইল তৈরিতে নেতৃত্বে দানের জন্য তাঁকে ‘মিসাইল ম্যান’ বলা হয়।
“If you want to leave your footprints on the sands of time, do not drag your feet.” – স্যার এ পি জে আবদুল কালাম।
তিনি এই উক্তিটির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনে বড় কোনো সফলতা অর্জন করতে হলে অলসতা ত্যাগ করে দৃঢ় সংকল্পের সাথে এগিয়ে যেতে হবে।
“Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep.”
তাঁর এই উক্তিটি যেন তরুণ প্রজন্মের জন্যই যারা দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তিনি সবসময় তরুণদের স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণ করার উৎসাহ প্রদান করতেন।
তিনি একদিনে স্যার এ পি জে আবদুল কালাম হয়ে ওঠেননি। এর পেছনে রয়েছে তাঁর মেধা, পরিশ্রম, সততা আর ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। পরিবার, শিক্ষক, সহকর্মীদের অনুপ্রেরণা তাঁর কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অন্তরের সৌন্দর্যই তাঁর কাছে মূখ্য বিষয় ছিল বলেই তিনি সাধারণভাবে জীবন নির্বাহ করেছেন।জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানান রকম বাধা, হিংসা-বিদ্বেষ অতিক্রম করে নিজের গুণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন এই মহান নেতা।
