এ পি জে আবদুল কালাম রচিত উইংস অব ফায়ার

এ পি জে আবদুল কালাম রচিত উইংস অব ফায়ার

আলিয়া নেফারতিতি

————————

“If you fail, never give up because F.A.I.L means ‘First Attempt in Learning’.”

ব্যর্থতা নিয়ে ইতিবাচক এই দৃষ্টিভঙ্গি এমন একজন ব্যক্তির যিনি সাধারণ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ। তিনি ছিলেন ভারতের একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সহজ-সরল আর সাদামাটা জীবনযাপন‌ই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। অত্যন্ত বিনয়ী এই মানুষটি তাঁর কাজের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন এবং ২০১৫ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করার পরেও মানুষ আজ‌ও তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘উইংস অব ফায়ার’। তিনি ‘মিসাইল ম্যান’ নামে খ্যাত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি স্যার এ পি জে আবদুল কালাম (আভুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম)।

ভারতের তামিলনাড়ুর দ্বীপ-শহর রামেশ্বরমের একটি মধ্যবিত্ত কিন্তু আদর্শ পরিবারে ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্যার এ পি জে আবদুল কালাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রামেশ্বরমে তিনি এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন যারা ছিলেন প্র্যাকটিসিং মুসলিম, তবে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্যার এ পি জে আবদুল কালামের বাবা জয়নুলাবদিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রামেশ্বরম মন্দিরের প্রধান পুরোহিত, পক্ষী লক্ষণা শাস্ত্রী। তাঁরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করতেন। এছাড়াও ‘মিসাইল ম্যান’ এর শৈশবে যে তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তাঁরা সবাই গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের হ‌ওয়া সত্ত্বেও একে অপরের বাড়িতে তাঁদের অবাধ যাতায়াত‌ ছিল। অর্থাৎ তিনি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছেন যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে—এই পরিচয়টাকে সবার ওপরে স্থান দেয়া হয়েছে। তাঁর আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বয়সে ১৫ বছরের বড় ভগ্নিপতি আহমেদ জালালুদ্দিন যিনি তাঁকে সবসময় শিক্ষিত লোকজন, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সমকালীন সাহিত্য, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অর্জনসহ বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় সম্পর্কে বলতেন। সংকীর্ণ পরিবেশের বাইরে একটা ‘সাহসী, নতুন দুনিয়া’ সম্পর্কে তাঁকে সচেতন করে তুলেছিলেন তাঁর এই বন্ধু। পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনায় আগ্রহী করে তোলার পেছনে জালালুদ্দিনের অবদান অনস্বীকার্য। একটি দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনের মাঝে বেড়ে ওঠায় সকল মানুষকে তিনি আপন করে নিতে পারতেন। তাঁর মানবিক মূল্যবোধ গঠনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্যার এ পি জে আবদুল কালামের জীবনজুড়ে রয়েছে পিতা জয়নুলাবদিনের আদর্শ। তিনি ছিলেন নৌকার মালিক এবং স্থানীয় মসজিদের ইমাম। খুব বেশি শিক্ষিত আর বিত্তবান তিনি ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ। সারা জীবনধরে ছেলে আবদুল কালাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের ভিতর দিয়ে বাবার সমকক্ষ হ‌ওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বাবা জটিলতম আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতেন। একবার বাবা জয়নুলাবদিন তাঁকে বলেন,

“নিজের সময়ে, নিজের জায়গায়, প্রকৃত‌ই নিজে যা, এবং যে স্তরে পৌঁছেছে—ভালো বা খারাপ—তাতে চিরন্তন সত্তার সমগ্রতার মধ্যে প্রতিটা মানুষ‌ই হচ্ছে নির্দিষ্ট উপাদান। সুতরাং অসুবিধা, ভোগান্তি আর সমস্যা-সংকট নিয়ে উৎকণ্ঠা কেন? সমস্যা যখন আসবে তখন তোমার ভোগান্তির প্রাসঙ্গিকতা বোঝার চেষ্টা করো। দুঃখ-দুর্দশা সর্বদা অন্তর্দৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি করে।” (পৃষ্ঠা নং ১৩-১৪)

এরপর তিনি তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করেন,”তোমার কাছে যারা সাহায্য ও উপদেশ নিতে আসে তাদের কেন এ কথা বলো না?” (পৃষ্ঠা নং ১৪)

কিছু সময় চুপ থেকে তিনি বলেন,

“মানুষ যখন‌ই নিজেকে নিঃসঙ্গ দেখতে পায়, তখন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে সে সঙ্গী খুঁজতে শুরু করে। যখন‌ই তারা কোনো সমস্যায় পড়ে, তখন‌ই কাউকে খুঁজতে থাকে যে তাদের সাহায্য করতে পারবে। যখন‌ই তারা কোনো কানাগলিতে পৌঁছায়, তখন‌ই এমন কাউকে খুঁজতে থাকে যে তাদের বেরিয়ে যাবার পথ দেখাতে পারবে। প্রতিটা পৌনঃপুনিক মানসিক বা শারীরিক যন্ত্রণা, আকুল আকাঙ্ক্ষা, এবং কামনা খুঁজে পায় নিজের বিশেষ সাহায্যকারী। নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে যারা আমার কাছে আসে তাদের ক্ষেত্রে বলতে গেলে আমি একজন মাধ্যম, প্রার্থনার ভিতর দিয়ে অশুভ শক্তির হাত থেকে তাদের নিষ্কৃতি পাওয়ার চেষ্টার মধ্যে। এটা মোটেও সঠিক পথ নয় এবং এটা কখন‌ও অনুসরণ করা উচিত নয়। ভাগ্যের ভীতি-তাড়িত দৃশ্য এবং আমাদের আত্মতৃপ্তির শত্রুকে খুঁজে বের করতে যা আমাদের সমর্থ করে সেই দৃশ্যের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা মানুষকে অবশ্যই বুঝতে হবে।” (পৃষ্ঠা নং ১৪)

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, পিতা জয়নুলাবদিন কখনো নিজের মতাদর্শকে পুত্র আবদুল কালামের ওপর চাপিয়ে দেননি। তাঁকে স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করার অধিকার দিয়েছেন। কাহলিল জিবরান থেকে উদ্ধৃতি নিয়ে তাঁর সহধর্মিণী আশিয়াম্মার অর্থাৎ আবদুল কালামের মাতাকে বলেন,”তোমার সন্তান তোমার নয়। তারা জীবনের পুত্র ও কন্যা। তারা তোমার ভিতর দিয়ে এসেছে কিন্তু তোমার থেকে আসেনি। তুমি তাকে হয়তো তোমার ভালোবাসা দিতে পারো কিন্তু তোমার চিন্তা দিতে পারোনা। যেহেতু তাদের নিজস্ব চিন্তা আছে।” (পৃষ্ঠা নং ২০)

যে মৌলিক সত্য বাবা জয়নুলাবদিন তাঁর কাছে উন্মোচিত করেছিলেন তা বোঝার জন্য তিনি প্রবল চেষ্টা করেছেন। তিনি অনুভব করেছেন যে, ঐশ্বরিক শক্তি বলতে কোনো সত্তা রয়েছে, যে সত্তা মানুষকে বিভ্রম, দুর্দশা, বিষণ্নতা ও ব্যর্থতা থেকে তুলে নিতে পারে এবং পথ প্রদর্শন করে মানুষকে তার প্রকৃত স্থানে নিয়ে যেতে পারে এবং একবার যদি কোনো ব্যক্তি তার আবেগ ও শরীরগত দাসত্বকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তাহলেই সে পেয়ে যায় মুক্তি, সুখ ও মানসিক প্রশান্তির পথ। এজন্য‌ই তো ব্যর্থতায় তিনি ধৈর্য ধরতে পেরেছিলেন এবং অর্জন করেছিলেন সফলতা।

রামেশ্বরমের এক সাধারণ স্কুলে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে স্যার এ পি জে আবদুল কালামের শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালীন তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সেন্ট জোসেফ’স কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে বি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর জীবনে এমন এক স্বপ্ন ছিল যা পূরণ করতে হলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে হবে। তিনি নিজেকে বললেন,” কখন‌ও না হ‌ওয়ার চেয়ে দেরিতে হ‌ওয়াও ভালো।” (পৃষ্ঠা নং ২৫)

স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তিনি মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে (এম‌আইটি) ভর্তির আবেদন জমা দেন এবং নির্বাচিত হন। কিন্তু সেখানে ভর্তি হতে প্রায় এক হাজার রূপি প্রয়োজন যা তাঁর বাবার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। সেই সময় তাঁর বোন জোহরা নিজের স্বর্ণের বালা ও চেইন বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে দেন। ভাইকে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে দেখতে চাওয়ার এই দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা সেদিন তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং নিজ উপার্জিত অর্থে বন্ধকি থেকে বোনের গহনা ছাড়িয়ে আনার শপথ নেন। পরবর্তীতে এম‌আইটিতে পড়াকালীন স্যার এ পি জে আবদুল কালাম অদম্য মেধার পরিচয় দেন এবং Aeronautical Engineering বিষয়ে যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর তিনি Hindustan Aeronautics Limited এ প্রশিক্ষণ নেন। ইরাডুরাই সলোমন, ফাদার টিএন সেকুয়েইয়ার, শিবসুব্রামানিয়া আয়ার, অধ্যাপক স্পন্ডার, অধ্যাপক শ্রীনিবাসন, অধ্যাপক কেএভি পান্ডালাই, অধ্যাপক নরসিংহ রাওসহ প্রমূখ শিক্ষকদের শিক্ষা এবং অনুপ্রেরণা তাঁর শিক্ষাজীবনসহ পরবর্তী জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মেধা, অধ্যাবসায়, অমায়িক আচরণ এবং গুণের দ্বারা তিনি শিক্ষকদের স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করে এবার কর্মজীবন শুরু করার পালা। স্যার এ পি জে আবদুল কালাম সর্বপ্রথম চেষ্টা করেন বিমানবাহিনীতে যোগ দেয়ার। কিন্তু অল্পের জন্য তিনি ব্যর্থ হন। এতে কষ্ট পেলেও হাল ছাড়েননি এই প্রতিভাবান ব্যক্তি। তিনি Defence Research and Development Organization (DRDO) – এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়া Indian Space Research Organization (ISRO) – এ বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি Defence Research and Development Laboratory (DRDL) এর পরিচালক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে তিনি কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। ২০০২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আন্না বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায়‌ও নিযুক্ত ছিলেন। এর বাইরেও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্যিক, দার্শনিকের অনুপ্রেরণামূলক উক্তি স্যার এ পি জে আবদুল কালামের কাজের স্পৃহা বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতো। তিনি সফলতা কিংবা ব্যর্থতায় এসব উক্তি স্মরণ করতেন।

“ভালোবাসা ছাড়া যে রুটি তৈরি করা হয় সে রুটি তিক্ত রুটি যা একজন মানুষের ক্ষুধা অর্ধেক মিটাতে পারে।”—কাহলিল জিবরান।” (পৃষ্ঠা নং ৪৯)

অর্থাৎ যেকোনো কাজের সার্থকতা নির্ভর করে সেটির পেছনের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার ওপর। স্যার এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর জীবনের সকল কাজ আন্তরিকতা এবং যত্ন সহকারে সম্পন্ন করতেন।

১৯৭৯ সালের ১০ আগস্টে SLV-3 রকেটের প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন স্যার এ পি জে আবদুল কালাম। Rohini Technology Payload (RTP) স্যাটেলাইটসহ SLV-3 স্টেজ ১ থেকে স্টেজ ২ এ মসৃণভাবে অতিক্রম করে। পরিচালক এবং তাঁর সকল সহযোগী আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন কারণ তাঁদের স্বপ্ন তখন আকাশে উড়ছিল। কিন্তু তাঁদের এ আনন্দ ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ দ্বিতীয় স্টেজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ৩১৭ সেকেন্ড পরে ফ্লাইটের অবসান ঘটে। এ ঘটনার পরে স্যার এ পি জে আবদুল কালাম প্রবল হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে ড. ব্রহ্ম প্রকাশ (প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা ও পথপ্রদর্শক) তাঁকে এবং টিম মেম্বারদের শান্ত রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছেন। নতুন উদ্যমে তাঁরা প্রকল্পের কাজ শুরু করেন।

১৯৮০ সালে যখন দ্বিতীয় SLV-3 উৎক্ষেপণের সীদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এটাকে কেন্দ্র করে সংশয়সূচক সংবাদ প্রকাশ করে যার কারণ ছিল প্রথমবার উৎক্ষেপণের ব্যর্থতা। একটি সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল,”প্রকল্প পরিচালক নিখোঁজ, যোগাযোগের জন্য তাঁকে পাওয়া যায়নি।” (পৃষ্ঠা নং ৯৪)

সমগ্র জাতির দৃষ্টি আবদ্ধ ছিল দ্বিতীয় SLV-3 উৎক্ষেপণের ওপর। অবশেষে ১৮ জুলাই ১৯৮০ সালে SLV-3 রকেটে করে Rohini RS-1 স্যাটেলাইট সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপিত হয়ে পৃথিবী পরিক্রমণ শুরু করে। এটি ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট যা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি রকেট দিয়ে মহাকাশে পাঠানো হয়। এমন সুসংবাদে সবখানে আনন্দ ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। ব্লক হাউজ থেকে বেরিয়ে আসার পর স্যার এ পি জে আবদুল কালামের তরুণ সহকর্মীরা তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সংবাদপত্রগুলো এ সাফল্যকে শিরোনাম করে সংবাদ প্রকাশ করে। পার্লামেন্ট ডেস্ক চাপড়ে অভিনন্দন জানায়। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কেবল করে তাঁর অভিনন্দন জানান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ছিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের—এই একশো ভাগ দেশীয় প্রচেষ্টায় প্রত্যেকেই গর্বিত হয়েছিলেন। স্যার এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর ‘উইংস অব ফায়ার’ ব‌ইয়ে লিখেছেন,” SLV-3 এর সফল উৎক্ষেপণের কৃতিত্ব প্রথমে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির মহানায়কদের; সুনির্দিষ্টভাবে অধ্যাপক সারাভাইয়ের; তারপর ভিএসসির (বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার) কয়েকশো’ কর্মীবৃন্দের এবং অধ্যাপক ধাওয়ান ও ড. ব্রহ্ম প্রকাশের।” (পৃষ্ঠা নং ৯৫)

এর মাধ্যমে তিনি প্রকল্পের সাথে জড়িত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

আমরা যেকোনো কিছুতে সফল হলে প্রথমে নিজেরা আনন্দিত হ‌ই এবং যাঁরা আমাদের অনুপ্রেরণা দেন তাঁদের সাথে সফলতার আনন্দ ভাগ করলে আমাদের উৎফুল্লতা বহুগুণে বেড়ে যায়। স্যার এ পি জে আবদুল কালামের‌ও ইচ্ছে করছিল তাঁর এই সফলতার আনন্দ বাবা জয়নুলাবদিন, ভগ্নিপতি জালালুদ্দিন এবং অধ্যাপক সারাভাইয়ের সাথে ভাগ করে নেয়ার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তাঁরা কেউই জীবিত ছিলেন না। এতে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন।

এছাড়াও পরবর্তীতে অগ্নি, পৃথ্বী, আকাশ, ত্রিশূল – এসব মিসাইল তৈরিতে নেতৃত্বে দানের জন্য তাঁকে ‘মিসাইল ম্যান’ বলা হয়। তিনি ভারতরত্ন, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণসহ বিভিন্ন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

“If you want to leave your footprints on the sands of time, do not drag your feet.” (পৃষ্ঠা নং ৭৫)

এই উক্তিটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনে বড় কোনো সফলতা অর্জন করতে হলে অলসতা ত্যাগ করে দৃঢ় সংকল্পের সাথে এগিয়ে যেতে হবে।

“Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep.”

তাঁর এই উক্তিটি যেন তরুণ প্রজন্মের জন্য‌ই যারা দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তিনি সবসময় তরুণদের স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণ করার উৎসাহ প্রদান করতেন। তরুণ প্রজন্মকে তিনি শুধু ভোগবিলাসের আর পুরস্কারের জন্য কাজ করার প্রবণতাকে ছাড়তে উপদেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, আমাদের সমাজের বৈশিষ্ট্য‌ই এমন যে মানুষের মনের মধ্যে সে প্রবিষ্ট করে স্থূল আকাঙ্ক্ষা—পুরস্কার, ধনসম্পদ, মর্যাদা, পদ, পদোন্নতি, অন্যের দ্বারা জীবনযাত্রা অনুমোদন, আনুষ্ঠানিক সম্মান আর সব ধরনের স্ট্যাটাস সিম্বল। আর এসব আকাঙ্ক্ষা একজন মানুষকে কখনোই প্রকৃত সুখী করতে পারেনা। তাই তিনি তরুণ প্রজন্মকে জীবনের এসব আত্ম পরাজয়ী পন্থা শিখতে বারণ করেছেন। স্যার এ পি জে আবদুল কালাম কখনোই খ্যাতির উদ্দেশ্যে কাজ করেননি, তিনি আজীবন দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

তিনি একদিনে স্যার এ পি জে আবদুল কালাম হয়ে ওঠেননি। এর পেছনে রয়েছে তাঁর মেধা, পরিশ্রম, সততা আর ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। পরিবার, শিক্ষক, সহকর্মীদের অনুপ্রেরণা তাঁর কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। রকেট বিজ্ঞান শেখার পেছনে তিনি সারাটা জীবন অতিবাহিত করেছেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অন্তরের সৌন্দর্য‌ই তাঁর কাছে মূখ্য বিষয় ছিল বলেই তিনি সাধারণভাবে জীবন নির্বাহ করেছেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানান রকম বাধা, হিংসা-বিদ্বেষ অতিক্রম করে নিজের গুণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন এই মহান নেতা। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই শিলংয়ের Indian Institute of Management (IIM) – এ তিনি নিজের প্রিয় কাজ—শিক্ষার্থীদের মাঝে কথা বলতে বলতে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই কিংবদন্তি নেতা নিজের জ্ঞান বিলিয়ে যাচ্ছিলেন।